ফেইথ মোবাইল বইটি লেখার সময় আমি বারবার ভাবছিলাম—কীভাবে কিশোর পাঠকদের যুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করা যায়। কিশোর বয়সে ধৈর্য কম থাকে, কিন্তু তাদের শেখার গতি থাকে খুব দ্রুত। তারা তত্ত্বের চেয়ে গল্পে বেশি আগ্রহী হয়, উপদেশের চেয়ে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বেশি শিখে। সেই কারণেই আমি ভ্রমণ উপন্যাসের কাঠামো বেছে নিয়েছি—যেখানে গল্প চলবে, পথ চলবে, আর সেই চলমানতার ভেতরেই সহজ ভাষায় যুক্তি ও তর্ক জায়গা করে নেবে।
আমার কাছে জরুরি মনে হয়েছে কিশোরদের যুক্তি আর কুযুক্তির পার্থক্য শেখানো। অনেক সময় অনেক কথাকে সাধারণভাবে যুক্তি বলে মনে হলেও আসলে সেগুলো থাকে কুযুক্তি। কিশোর বয়সেই যুক্তি ও কুযুক্তির পার্থক্য বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে তুলনামূলক কঠিন বিষয় বোঝাও সহজ হয়ে যায়। বিজ্ঞান মানে শুধু পরীক্ষাগার বা সূত্র নয়; বিজ্ঞান মানে প্রশ্ন করা, যাচাই করা, প্রমাণ খোঁজা। এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই আমি গল্পের ভেতর দিয়ে পৌঁছে দিতে চেয়েছি।
আমাদের সমাজে এখন ধর্মনির্ভর, বিশ্বাসনির্ভর বইয়ের ছড়াছড়ি। এসব বই শিশু-কিশোরদের যুক্তিনির্ভর করে তোলার বদলে বিশ্বাসনির্ভর করে তোলে। কৌতূহলী করার বদলে অন্ধবিশ্বাসী বানায়। প্রশ্ন করতে শেখানোর বদলে প্রশ্নকে ভয় পেতে শেখায়। কিশোরদের কোমল মনে এর প্রভাব গভীর ও ভয়াবহ হতে পারে—এই বাস্তবতা আমি এড়িয়ে যেতে পারিনি।
এই প্রসঙ্গে ফাইনান্সিয়াল পোস্ট-এ দেওয়া আমার একটি বক্তব্য বিষয়টিকে স্পষ্ট করে—
“আমি চেয়েছি কিশোররা এই গল্পে শুধু ভ্রমণের রোমাঞ্চ না খুঁজে, বরং নিজের ভেতরে প্রশ্ন করার জায়গাটা খুঁজে পাক। ভ্রমণ যেমন মানুষকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করে, তেমনি বিশ্বাস ও ভাবনার সীমানাও নড়বড়ে করে দেয়—এই অনুভূতিটাই তুলে ধরতে চেয়েছি। বর্তমান সময়ে কিশোরদের জন্য এমন গল্পের প্রয়োজন, যেখানে বিনোদনের পাশাপাশি চিন্তার খোরাক থাকবে। সেই ভাবনা থেকেই ‘ফেইথ মোবাইল’–এর পরিকল্পনা।”
আমার চেষ্টা একটাই—কিশোর পাঠকদের প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখানো, কুসংস্কারের প্রতি সতর্ক করা, এবং শেষ পর্যন্ত একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার পথে সামান্য হলেও সহায়তা করা। আমি চেয়েছি পাঠক বুঝুক—বিশ্বাস হোক বা অবিশ্বাস, কোনোটাই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সংশয় জরুরি। কৌতূহল জরুরি। প্রশ্ন করা জরুরি। প্রশ্ন না করলে চিন্তা স্থবির হয়ে যায়, আর স্থবির চিন্তা থেকেই কুসংস্কার জন্ম নেয়।
এই বইয়ের একটি বড় উদ্দেশ্য কিশোর পাঠকদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে উৎসাহিত করা। বিজ্ঞান মানে শুধু সূত্র বা পরীক্ষা নয়—বিজ্ঞান মানে প্রশ্ন করা, প্রমাণ খোঁজা, কুযুক্তি চিনে ফেলা। গল্পের ভেতরে থাকা ভূতত্ত্ব, প্রকৃতি, গুহা, অরণ্য, মরুভূমি—এসব কেবল ভ্রমণের অনুষঙ্গ নয়; এগুলো কিশোর পাঠকদের বাস্তব পৃথিবী, প্রকৃতি ও জ্ঞানের প্রতি কৌতূহলী করে তোলার একটি প্রয়াস।
এই বিষয়ে জাগোনিউজ২৪-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আমি বলেছিলাম—
“বইটি একটি ভ্রমণ কাহিনি হলেও এটি কিশোর পাঠকদের চিন্তার জগৎকে নাড়া দিতে সক্ষম। গল্পে রয়েছে পথের ধুলো, আকাশের নীরবতা ও প্রশ্নে ভরা কিশোর মন। আছে গুহা, অরণ্য ও মরুভূমি, আবার তারাভরা রাতের নিচে জন্ম নেওয়া প্রশ্ন, দ্বিধা, হাসি ও ভাবনা।”
আমি চেয়েছি কিশোররা বুঝুক—সব দাবি সত্য নয়, সব কথার পেছনে যুক্তি থাকে না। কুযুক্তি কীভাবে কাজ করে, আবেগ কীভাবে যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়, কুসংস্কার কীভাবে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হতে শুরু করে—এসব বিষয়ে তারা যেন সতর্ক হয়। ফেইথ মোবাইল (Faith Mobile) সেই সতর্কতার জায়গাটাই তৈরি করতে চায়।
আমি বিশ্বাস করি—একজন মানুষ কতটা মানবিক, সেটাই আসল প্রশ্ন। সে প্রশ্ন করতে পারে কি না, অন্যের কথা শুনতে পারে কি না, ভিন্ন মত সহ্য করতে পারে কি না—এই গুণগুলোই একজন ভালো মানুষ গড়ে তোলে। ফেইথ মোবাইল সেই মানুষটাকেই খুঁজে ফেরে—রাস্তার ধুলো আর তারাভরা রাতের ভেতর দিয়ে।
লেখক : নাফিস সাদিক শাতিল / NAFIS SADIQUE SHATIL

