একটি বহুল প্রচলিত মিথ্যাচার হল – রোজার মাধ্যমে নাকি ক্যান্সার সেরে যায়! এমনকি অনেক ডাক্তারকে পর্যন্ত বলতে শোনা যায় – জাপানি বিজ্ঞানী ওসুমি নাকি রোজার উপর গবেষণা করেই নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন! এসব কথা হাস্যকর মনে হলেও বাস্তবতা হল – বাংলাদেশের অনেক সাধারণ মানুষ এসব মিথ্যাচার ধরতে পারেননা। ওয়াজের মঞ্চে, ডাক্তারদের কাছে বা বিভিন্ন সেলিব্রেটিদের কাছ থেকে এধরণের কথা শুনে তারা বিভ্রান্ত হয়, প্রতারিত হয়। এসব মিথ্যাকে তার তখন সত্য বলেই ধরে নেয়।
আসলে কি রোজার মাধ্যমে সুস্থতা আদৌ সম্ভব? রোজা রাখলে কি কোন রোগ আদৌ সারে? আসলেই কি রোজা নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পেয়েছিলেন জাপানি বিজ্ঞানী? অটোফেজির মাধ্যমে কি সত্যিই ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়? আজকের ব্লগে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করবো।
২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইওশিনোরি ওসুমি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘মেকানিজম অফ অটোফেজি’। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের কিছু জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব দাবি করেন যে ওসুমি ‘রোজার’ ওপর গবেষণা করে নোবেল পেয়েছেন। এটি একটি ডাহা মিথ্যা এবং জালিয়াতি। নোবেল কমিটির অফিসিয়াল সাইটে প্রেস রিলিজে স্পষ্ট লেখা আছে: “for his discoveries of mechanisms for autophagy”। অর্থাৎ তিনি নোবেল পেয়েছিলেন অটোফ্যাগির মেকানিজম আবিষ্কারের জন্য। পুরো নথিপত্রে কোথাও ‘Fasting’ বা ‘Ramadan’ শব্দের কোনো অস্তিত্ব নেই। ওসুমি তার গবেষণাটি করেছিলেন ‘ইস্ট’ বা এক কোষী ছত্রাকের ওপর। তিনি কোষের ভেতরের একটি ক্ষুদ্র জৈবিক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন, কোনো ধর্মীয় রীতির সপক্ষে ওকালতি করেননি।
মানুষের শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়াটি সিগনিফিক্যান্টলি বা দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছাতে সাধারণত ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত ক্রমাগত উপোসের প্রয়োজন হয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মেটাবলিক স্টাডিজ অনুসারে, ২৪ ঘণ্টার আগে অটোফেজি তার পূর্ণ গতি পায় না। এখন প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর কোথায় ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা টানা রোজা রাখা হয়? ২৪ ঘন্টাই বা কোথায় রাখা হয়? আমাদের প্রচলিত রোজা সাধারণত ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার হয়ে থাকে। এই সময়ের মধ্যে শরীরের গ্লুকোজ লেভেল কিছুটা কমলেও কোষের ভেতর অটোফেজি নামক সেই ‘রিসাইক্লিং অভিযান’ শুরু হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় না। বরং পৃথিবীর কিছু বিশেষ ধর্মে বা বিশেষ সাধনায় একটানা কয়েকদিন উপবাসের নিয়ম আছে। যদি উপবাসের দীর্ঘসূত্রিতাই বিজ্ঞানের মাপকাঠি হয়, তবে সেই দীর্ঘ উপবাসগুলোকেই তো বেশি ‘সাইন্টিফিক’ বলতে হবে। মাত্র ১৩-১৪ ঘণ্টার রোজাকে অটোফেজির সাথে মিলিয়ে নোবেল জয়ের গল্প শোনানো মূলত অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অটোফেজির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পানি। অটোফেজি মূলত ‘নিউট্রিয়েন্ট রেস্ট্রিকশন’ বা পুষ্টির অভাবের একটি প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য পানি অপরিহার্য। অটোফেজি চলাকালীন কোষের আবর্জনাগুলো লাইসোজোমে গিয়ে বিষমুক্ত হয়। এই রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং টক্সিন শরীর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন। বিজ্ঞান বলছে, পানি ছাড়া দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে শরীরে ‘মেটাবলিক স্ট্রেস’ বা বিপাকীয় চাপ বেড়ে যায়। এতে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশনের ফলে কিডনির ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে এবং রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। অটোফেজি নিয়ে ইঁদুরের ওপর করা গবেষণার প্রতিটি মডেলে প্রাণীদের খাবার বন্ধ থাকলেও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা হয়েছিল। পানি ছাড়া দীর্ঘ উপবাস উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করে। তাই পানি বর্জন করে অটোফেজির সুবিধা পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।
এছাড়াও অটোফেজি সবার জন্য একইভাবে কাজ করে না। একজন কিশোর বা যুবকের শরীরে মেটাবলিজম যেভাবে কাজ করে, একজন ৬০ বছর বয়সী মানুষের শরীরে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের কোষের ‘অটোফ্যাজিক ক্যাপাসিটি’ বা আবর্জনা পরিষ্কারের ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবেই কমে যায়। একজন বয়স্ক মানুষের জন্য দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা হিতে বিপরীত হতে পারে, কারণ এতে তার পেশি ক্ষয় এবং শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের ঘাটতি দেখা দেয়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে অটোফেজি প্রক্রিয়াটি অনেক সময় সঠিকভাবে কাজ না করে উল্টো কোষের ক্ষতি করতে পারে। তাই নির্বিচারে সব বয়সের মানুষের জন্য অটোফেজি বা রোজা বিজ্ঞানসম্মত নিরাময় পদ্ধতি—এমন দাবি করা চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
এছাড়াও একটি অত্যন্ত প্রচলিত মিথ্যাচার হলো—অটোফেজির মাধ্যমে ক্যান্সার সেল ধ্বংস হয়ে যায়। ক্যান্সার বা আলঝেইমারের মূল ভিত্তি হলো কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি বা প্রোটিন জমা হওয়া। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ‘টার্গেটেড অটোফেজি’। এর মানে হলো, শরীরের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় যেখানে ক্যান্সার হয়েছে, কেবল সেই কোষগুলোকে ধ্বংস করা। কিন্তু রোজা বা উপবাসের মাধ্যমে সারা শরীরে যে অটোফেজি উদ্দীপিত হয়, সেটি অনেক সময় ক্যান্সার কোষকে মরার বদলে উল্টো বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। ক্যান্সার কোষগুলো অনেক সময় অটোফেজি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে কেমোথেরাপি বা বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করে এবং পুষ্টি সংগ্রহ করে নতুন জীবন লাভ করে। বিজ্ঞান একে বলে ‘প্রো-টিউমোরাল ভূমিকা’। অর্থাৎ অটোফেজি কখনো ক্যান্সার ঠেকায়, আবার কখনো ক্যান্সার কোষকে শক্তিশালী করে। এ বিষয়ে এখনো অনেক গবেষণার প্রয়োজন আছে।
যদি রোজাই অটোফেজি হতো এবং এর মাধ্যমে সকল ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যেত, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির মতো ব্যয়বহুল এবং যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করত না। ডাক্তাররা তখন রোগীদের শুধুমাত্র রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েই সুস্থ করে তুলতেন।
যদি রোজার মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব হতো, তবে সারা বিশ্বে যারা নিষ্ঠার সাথে রোজা পালন করেন, তাদের কারোরই ক্যান্সার হতো না। কিন্তু বাস্তবচিত্র কী? আমাদের চারপাশে এমন অনেক আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশী আছেন যারা সারাজীবনে একটি রোজাও বাদ দেননি, অথচ তারাও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন। কারণ ক্যান্সার একটি জটিল রোগ যা কেবল না খেয়ে থাকা বা অটোফেজির সরল সমীকরণ দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। ধর্মকে বিজ্ঞানের মোড়কে সস্তা জনপ্রিয় করার জন্য এই ধরণের মিথ্যাচার মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। বিজ্ঞান চলে প্রমাণ আর তথ্যের ভিত্তিতে, আবেগ বা কাল্পনিক গল্পের ভিত্তিতে নয়।
তাই যারা রোজার সাথে অটোফেজিকে মিলিয়ে ইসলামিক রীতিনীতিকে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের চেষ্টা করে তারা হয় না জেনে কথা বলে, নাহলে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যাচার করে।
ব্লগার: নাফিস সাদিক শাতিল
Blogger: NAFIS SADIQUE SHATIL

