প্রথমেই একটি হাদিস জেনে নেয়া যাকঃ গ্রন্থের নামঃ সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), হাদিস নাম্বার ১১৩৪, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন। হাদিসের মান সহিহ।
অর্থাৎ ইসলামে পুর্বে কোন ঈদ ছিলোনা। কোন উৎসব ছিলনা। আপনারা অনেকেই জানেন নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাতের মত ইসলামের বেসিক বিষয়গুলো কোন মৌলিক বিষয় নয়। এগুলো সবই অন্য কোন ধর্ম থেকেই কপি করা হয়েছে। বাংলায় বললে নকল করা হয়েছে। একইভাবে ঈদ বিষয়টাও ইসলামের কোন মৌলিক বিষয় নয়। অন্যান্য বিষয়ের মতই এটিও অন্য ধর্ম থেকেই এসেছে।
নবী মুহাম্মদ যখন মক্কা থেকে মদিনায় গেলেন। তখন মদিনার নাম ছিল ইয়াসরিব। মদিনায় পৌছানোর পর তিনি দেখলেন সেখানকার মানুষ বছরে দুটি নির্দিষ্ট দিনে বিশেষ আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। এই উৎসব দুটির নাম ছিল ‘নওরোজ’ এবং ‘মেহেরজান’। নওরোজ ছিল মূলত বসন্তকালীন বিষুব বা নতুন বছরের উৎসব, যা ফারসি শব্দ ‘নও’ যার অর্থ নতুন ও ‘রোজ’ অর্থাৎ দিন থেকে এসেছে। বসন্তকালীন বিষুব বলতে বছরের সেই সময়কে বোঝায়, যখন দিন ও রাতের দৈর্ঘ প্রায় সমান থাকে। এই সময়েই নওরোজ উৎসব পালিত হতো। আর এর ঠিক ছয় মাস পর শরতের আগমনে পালিত হতো ‘মেহেরজান’, যা ছিল মূলত ফসল ঘরে তোলার আনন্দ বা কৃতজ্ঞতার উৎসব। যদিও এই উৎসব দুটির আদি উৎস ছিল প্রাচীন পারস্য বা ইরান এবং এর সাথে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের যোগসূত্র ছিল, কিন্তু তৎকালীন আরবের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ফলে মদিনার সমাজেও এর ব্যাপক প্রচলন ঘটে এবং সামাজিক উৎসব হিসেবে পরিচিতি ও চর্চা ঘটে।
এ প্রসঙ্গে আরো একটি হাদিস উল্লেখ করিঃ মুসা ইবনে ইসমাঈল (রহঃ) ………… আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ্বীনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা দুইটি দিন (নায়মূক ও মেহেরজান) খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, এই দুইটি দিন কিসের? তারা বলেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে অন্য দুইটি উত্তম দিন দান করেছেন এবং তা হল: কোরবানীর ঈদ এবং রোযার ঈদ। হাদিসের মান সহিহ।
উল্লেখ্য যে এই হাদিসে নায়মূক বলতে মূলত নওরোজ উৎসবকেই বোঝানো হয়েছে। একেক এলাকায় এই উৎসবকে একেক নামে ডাকা হতো।
মদিনার সামাজিক বাস্তবতায় এই উৎসবগুলো ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। শহরের প্রধান দুই আরব গোত্র—আউস ও খাজরাজ—যারা তখন মূলত মূর্তিপূজারি বা পৌত্তলিক ছিল, তারা এই দিন দুটিকে তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে মদিনা অর্থাৎ তৎকালীন ইয়াসরিবে বসবাসরত ইহুদি গোত্রগুলো—যেমন বনু কুরাইজা, বনু নাদির এবং বনু কায়নুকা—ধর্মীয়ভাবে তাদের নিজস্ব উৎসব পালন করলেও, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে তারাও নওরোজ ও মেহেরজানের মেলা এবং আনন্দ-আয়োজনে অংশ নিত। সেই সময় মদিনা ছিল বিভিন্ন ধর্মের মানুষের এক মিলনস্থল, আর এই উৎসব দুটি ছিল সবার মিলেমিশে আনন্দ করার একটি সাধারণ উপলক্ষ।
এই উৎসবগুলো ছিল মূলত ভোগ-বিলাস আর বীরত্ব প্রদর্শনীতে ভরপুর। উৎসবের দিনগুলোতে বিশাল মেলার আয়োজন করা হতো, যেখানে দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা কেনাবেচা করতে আসতো। যুবক ও বীরেরা মেতে উঠতো শারীরিক কসরত, দৌড় প্রতিযোগিতা এবং মল্লযুদ্ধ বা কুস্তির লড়াইয়ে। নারীরা দফ বাজিয়ে গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো। উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল একে অপরকে মিষ্টি ও সুগন্ধি উপহার দেওয়া। এই দুই উৎসব ছিলো সার্বজনীন উৎসব। মদিনার সকল ধর্মের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ঐ দুটো উৎসবে অত্যন্ত আনন্দের সাথে অংশগ্রহণ করতো। ধর্মীয় উৎসবের পরিবর্তে এই উৎসবগুলো পরিণত হয়েছিলো সার্বজনীন সামাজিক উৎসবে।
নবী মুহাম্মদের মদিনায় আগমনের পর সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণের এই দুটো উৎসব বাদ দিয়ে তিনি সেখানে চালু করলেন দুটো ধর্মীয় উৎসব। পৌত্তলিকদের অনুকরণে এভাবেই জন্ম নিয়েছিল ইসলামের প্রধান দুটো ধর্মীয় উৎসর অর্থাৎ দুই ঈদ।
এতক্ষণের আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে ঈদ ইসলামের কোন অরিজিনাল উৎসব নয়। ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বেই মদিনার লোকেরা দুটো উৎসব পালন করতো। তাদের দেখাদেখি ইসলামেও দুটো ঈদের প্রচলন ঘটে। এখন আসি ভিন্ন বিষয়ে।
ঈদ কি আসলে কোন উৎসব?
ঈদের দিন ঈদ উপলক্ষে ২ রাকাত ওয়াজিব নামাজ পড়া হয়। নামাজ কি কোন উৎসব? নামাজের সাথে উৎসবের সম্পর্ক কি? নামাজ তো বছরে ৩৬৫ দিনই পড়া হয়। উৎসবে যদি আনন্দ না থাকে, উদযাপন না থাকে, হাসি না থাকে, উচ্ছ্বাস না থাকে, সকলের অংশগ্রহণ না থাকে- তাহলে সেটা উৎসব হয় কি করে?
বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের উৎসব যারা কখনো দেখেনি, তাদের কাছে ঈদকে উৎসব মনে হলেও হতে পারে। তাদের সেসব উৎসবে থাকে রঙের মেলা, থাকে আল্পনা, থাকে গান-নৃত্য, থাকে বিভিন্ন ট্রাডিশনাল খাবার-দাবার, পোশাক-আশাকের সমারোহ। তারা নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী তাদের দোকানপাট, বাড়িঘর আলোকসজ্জা করে, আল্পনা আঁকায়। উৎসবের ভেতরে থাকে বিভিন্ন পশু-পাখিকে খাওয়ানোর উৎসব, সাজগোজের উৎসব। প্রাণীজগতের মঙ্গল কামনায় থাকে দৃষ্টিনন্দন র্যালী। বিভিন্ন স্থানে দলবদ্ধভাবে সঙ্গীত কিংবা নৃত্য। ঈদে কি এগুলোর একটিও আছে?
লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন এসমস্ত বিষয়ই ইসলামে হারাম। তারা না পারবে সাজগোজ করতে, না পারবে আলোকসজ্জা করতে, না পারবে গান করতে, না পারবে নৃত্য করতে, না পারবে চিত্রাঙ্কণ করতে। তাদের জন্য গান হারাম, নাচ হারাম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হারাম, চিত্রাঙ্কণ হারাম। শুধু হারাম আর হারাম। মানুষের আত্মিক প্রশান্তির জন্য যা যা দরকার সবই হারাম। ক্রিয়েটিভ বিষয়গুলোই হারাম। ইসলামে কোন ট্রাডিশনাল জামাকাপড় নেই, সাজগোজ নেই, নাচ-গান নেই, খাবার দাবার নেই। এগুলো ছাড়া কি উৎসব হয়?
ফেস্টিভ্যাল মানুষের মানসিক অবস্থার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। একইভাবে গান, নৃত্য, চিত্রাঙ্কণ মানুষের মনকে প্রশান্ত করে। ইসলাম আবির্ভাবের হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষ এগুলোতে অভ্যস্ত। তাই মাত্র দেড় হাজার বছর আগের কোন মতবাদের পক্ষে হোমো স্যাপিয়েন্সের জিন থেকে এসব মেমোরি মুছে ফেলা অসম্ভব।
আরবের মদিনার অধিবাসীদের দুটো সার্বজনীন উৎসবের দেখাদেখি নবী মুহাম্মদ দুটো ঈদ চালু করেছিলেন। এটা মেনে নেয়া কঠিন হলেও এটাই বাস্তব। ইসলামে এভাবেই ঈদের প্রচলন ঘটে।
লেখক: নাফিস সাদিক শাতিল / NAFIS SADIQUE SHATIL


